অস্ত্র ব্যবসার অর্থনীতি ও দারিদ্র্যসীমা
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৭, ১০:০৬
অস্ত্র ব্যবসার অর্থনীতি ও দারিদ্র্যসীমা
সাকলাইন খুরশিদ
প্রিন্ট অ-অ+

বেশ কয়েকদিন আগে, সুইডেনের স্বনামধন্য ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (SIPRI) বিশ্বের অস্ত্র ব্যবসার উপর কিছু চিত্তাআকর্ষক তথ্য প্রকাশ করে যা খুব ভয়ংকর কিছু তথ্যরূপে পাঠকদের সামনে উপস্থিত হয়েছে।


গবেষণায় দেখানো হয়, আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসা কিভাবে পাঁচ (১৯৫৫-১৯৬০) বছরে অবনতির দিকে এগিয়ে আবার ঠাণ্ডা যুদ্ধ (১৯৬০-৮০) চলাকালে উন্নতির দিকে আগাচ্ছে। ১৯৮০ সালে মিখাইল গর্বাচভ যখন ঠাণ্ডা যুদ্ধ শেষ করবার লক্ষ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন এর কৌশলগত নীতিগুলোকে ঝালাই করতে লাগলেন তখন অস্ত্র ব্যবসার গ্রাফ আবারো নিম্নমুখী।


গবেষকরা আশা করেছিলেন অস্ত্র ব্যবসার প্রতিযোগিতা বোধহয় এবার শেষের দিকে, অস্ত্র না কিনে রাষ্ট্রগুলো সে টাকা বোধহয় এবার দেশের জনগণের জীবনযাপনের মান উন্নয়নের কাজে লাগাবে কিন্ত্ নব্বই এর দশকের মধ্যভাগে অস্ত্র ব্যবসায় ভাটা পড়লেও নয়া শতাব্দিতে অস্ত্র ব্যবসা পায় নবজোয়ার। এরই ধারাবাহিকতায়, ২০১২-২০১৬ এ পাচ বছর সময়কালে অস্ত্র ব্যবসার হার ২০০৭-২০১১ সাল থেকে ৮.৪ শতাংশ বেশি।


পাঁচ বছরের সময়সীমার হিসাব, যা ১৯৯০ সালের পর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। ২০১২-২০১৬ সালে অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে আছে পর্যায়ক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স এবং জার্মানি। অন্যদিকে, আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকার প্রথমে আছে ভারত, তারপরে আছে পর্যায়ক্রমে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, চীন, আলজেরিয়া।


২০১২-১৬ সালের মধ্যে ভারত যে পরিমাণ অস্ত্র কিনেছে তা ২০০৭-১১ এর তুলনায় তা ৪৩ শতাংশ বেশি, আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে ৬৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু সৌদি আরবের অস্ত্র ক্রয় বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে ২১২ শতাংশ।


ইদানিংকালে ভারতের অস্ত্র আমদানি তার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীন এবং পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। মজার তথ্য হল পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানি উল্টো কমেছে ২৮ শতাংশ।


সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানিকারক দেশ ভারতে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা লোকের সংখ্যা ২৬০ মিলিয়ন। দারিদ্র্যসীমার স্কেলকে যদি দৈনিক ৩.১০ ডলার ডলারে স্থাপন করা হয় তাহলে বিস্ময়করভাবে অর্থনীতিবিদরা দেখতে পাচ্ছেন ভারতে দরিদ্র লোকের সংখ্যা ৭৩২ মিলিয়ন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান সি রাংরাজনের নেতৃত্বে হওয়া এক গবেষণায় পাওয়া তথ্যানুসারে ভারতের ৩৬৩ মিলিয়ন বা মোট জনসংখ্যার ২৯.৫ শতাংশ মানুষ দরিদ্র।


বাংলাদেশের অস্ত্র আমদানি আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার ০.২ শতাংশ হলেও ২০০৭-২০১১ সালের সাথে সাম্প্রতিক তুলনায় এ হার বেড়ে দাড়াচ্ছে ৬৮২ গুণ বেশি! অপরদিকে বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা লোকের সংখ্যা ২৮ মিলিয়ন।


অতএব, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্ত্র ব্যবসার সুবিধাভোগী কারা এ নিয়ে কোনো দ্বিমত না থাকলেও গরিব দেশের জাতীয় সীমায় বাস করা গরিবদের কি সুবিধা এতে হচ্ছে তা নিয়ে বিতর্কের যথেষ্ট অবকাশ আছে। ২৮ মিলিয়ন দারিদ্যসীমার দেশ বাংলাদেশে বাস করে এ অবস্থায় চুপ করে থাকা মহীনের ঘোড়াগুলির গানের আদলে নিজেদের গায়ে বেহায়ার তকমা জুটিয়ে নেয়া। সবশেষে গানটির কলিই তুলে দিলাম–


‘এই মুহূর্তে, কোন অলিখিত শর্তে


গোপনে গোপনে চলে লেনদেন বিকিকিনি যতো মারণাস্ত্র


এই মুহূর্তে, কোন ভাঙ্গা দেশ জুড়তে


দুঃখী মানুষের শোকে কনসার্টে গান গায় কতো মাইস্ত্রো


পারি না পারি না কেন বুঝতে, একি প্রপঞ্চ মায়া


এ বিশ্ব রূপ দেখে চুপ করে থাকি যদি


আমি নেহাতই বেহায়া ...।’


● অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক আনিস চৌধুরীর মূল লেখা থেকে ভাবানুবাদ


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com