সাতক্ষীরার পণ্য সারাবিশ্বে পৌঁছে দিতে চান হাসান রাজ
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০১৮, ১৭:৪৬
সাতক্ষীরার পণ্য সারাবিশ্বে পৌঁছে দিতে চান হাসান রাজ
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

সাতক্ষীরার ছেলে হাসান রাজ এইচএসসি পাস করে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভারসিটিতে (ডিআইইউ) কম্পিউটার সাইন্সে বিএসসি করেন। এখন কি করা যায়? ভাবতে-ভাবতে মাথায় আসে, নিজের জেলার বিখ্যাত পণ্যসমূহ সারা দেশেএবং সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিলে কেমন হয়?


যেই ভাবা সেই কাজ। হাসান রাজ শুরু করেন ই-কমার্স ব্যবসা। যদিও তখন পর্যন্ত ভাল করে জানতেনই না ই-কমার্স ব্যবসার কারিগরি বিষয়গুলো। আর এখন সেই হাসান রাজ ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)-এরস্টার্টআপ অ্যান্ড ফান্ডিং স্ট্যান্ডিং কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, স্টোরিয়ার বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ এবং সাতক্ষীরাশপ.কমের ডিরেক্টর ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সাতক্ষীরাশপডটকম একটা জনপ্রিয়ই-কমার্স সাইট।


সম্প্রতি রাজধানীর কাঁঠাবাগান এলাকায় সাতক্ষীরাশপের কার্যালয়ে বিবার্তার সাথে কথা বলেন তরুণ উদ্যোক্তা হাসান রাজ। জানান ই-কমার্স প্লাটফর্ম সাতক্ষীরাশপের শুরু থেকে বর্তমান হালচাল।



হাসান রাজের জীবনের সেই গল্পটা বিবার্তা পাঠকদের জানাচ্ছে উজ্জ্বল এ গমেজ।


হাসান রাজ অকপটে স্বীকার করেন, যখন ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করি তখন এসম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। গুগলে সার্চ করেও ই-কমার্স সম্পর্কে বাংলায় কোনো কন্টেন্ট পাওয়া যেত না। বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু-কিছু জেনে নিয়ে আরইন্টারনেট থেকে পড়ে-পড়ে ই-কমার্স ব্যবসার ধারণা নিই।


মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়ার পরও কীভাবে ব্যবসাটা শুরু করবেন চিন্তায় পড়ে যান হাসান। তখন এক বন্ধুর কাছে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)-এর প্রেসিডেন্ট রাজীব আহমেদের কথা শুনে তাঁর শরণাপন্ন হন।


হাসান বলেন, রাজিব ভাইয়ের সাথে যখন আমি প্রথম যোগাযোগ করি তখন তিনি আমাকে স্কাইপ আড্ডায় আমন্ত্রণ জানান। মূলত সেই আড্ডার পরই আমি ই-কমার্সে আসার পাকাপাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। এর আগে এসব বিষয়ে আমারএত কিছু জানা ছিল না। কিন্তু রাজিব ভাইয়ের উৎসাহে এবং অন্য অনেকের সহযোগিতায় আমি ই-কমার্সে আসতে আর ভয় পাই না।


স্থানীয় কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে কাজ করছে সাতক্ষীরাশপডটকম। এপণ্যগুলো হলো- সুন্দরবনের মধু, সাতক্ষীরার সন্দেশ, চিংড়ি ও ঘি।



হাসান বলেন, চারিদিকে ভেজালের ছাড়াছড়ি। শহরের মানুষের মুখে গ্রামের খাঁটি পণ্য ওঠেই না। উঠলেও খুবই কম। এসব ভেবে ই-কমার্সের মাধ্যমে সাতক্ষীরার বিখ্যাত কিছু পণ্য সারাদেশ ও সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে২০১৫ সালের ৮ জুলাই ই-ক্যাব কার্যালয়ে চালু করি ই-কমার্স সাইট সাতক্ষীরাশপডটকম (satkhirashop.com)।


হাসান বলেন, ই-কমার্সের মাধ্যমে যেকোন পণ্য খুব সহজেই ঘরে বসে পেতে পারেন যে কেউ। আমরা যখন কাজ শুরু করি তখন ভেবেছিলাম পরিচিতি পেতে এবং মানুষের কাছে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু তার বদলে আমরাঅবাক হয়ে দেখলাম, অনেক মানুষ, অনেকে বড় বড় ডিলারও নিজে থেকেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। দেশের বাইরে থেকেও অনেকে জানতে চেয়েছেন এক্সপোর্ট করব কি না। এই বিষয়গুলো আমাকে আরো উৎসাহী করেতোলে।


এভাবে শুরু থেকেই হাসান দেখলেন সবার কাছেই খাঁটি মধু ও ঘি-এর চাহিদা প্রচুর এবং বড় বড় কিছু কম্পানিও তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে থাকেন। তখন তিনি উপলব্ধি করেন যে খাঁটি দেশি পণ্য নিয়ে ই-কমার্সের ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বলতবে বড় কম্পানিগুলো যখন যোগাযোগ করে তখন একদিকে তিনি যেমন খুশি হন অন্যদিকে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কারণ, তিনি একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তার বিশাল মূলধন নেই। তাছাড়া কম্পানিগুলোর শর্ত ছিল, পণ্যগুলো বিএসটিআই/সাইন্সল্যাবের টেস্টে উত্তীর্ণ হতে হবে। কিন্তু সেই ল্যাব টেস্ট করার মতো টাকাও তার ছিল না।



বিষয়টা নিয়ে ই-ক্যাবের কাছে গেলে তখন সাতক্ষীরাশপডটকমের জন্য ক্রাউড ফান্ডিংয়ের উদ্যোগ নেন ই-ক্যাব প্রেসিডেন্ট। তিনি ই-ক্যাবের ফেসবুক গ্রুপে সকলের সহযোগিতা চেয়ে একটি পোস্ট দেন। মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে ল্যাবটেস্টের জন্য যে পরিমাণ টাকা দরকার, তা উঠে আসে।


সেই স্মৃতি হাতড়ে হাসান বলেন, আমি কল্পনাও করিনি এত অল্প সময়ে এতোগুলো টাকা তুলে আনা সম্ভব হবে। ই-কমার্স ফেসবুক গ্রুপ বন্ধুদের নতুন উদ্যোক্তার প্রতি আন্তরিকতা ও ভালোবাসা দেখে আমি অভিভূত! যারা আমাকে এভাবেসাহায্যে এগিয়ে এসেছেন তাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।


চারিদিকে ভেজালের ছাড়াছড়ি। আপনার বিক্রিত পণ্যে নিশ্চয়তা কতটুকু - এমন প্রশ্নের জবাবে হাসান বলেন, আমার মূল চিন্তাটাই ছিল যে আমি খাঁটি পণ্যটা মানুষের কাছে পৌঁছে দেব। তা নিশ্চিত করতে গেলে আমি দেখলাম যে, বাইরেথেকে নিলে তা খাঁটি কি না - এরকম একটা অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। তাই আমাকেই পণ্য উৎপাদনে যেতে হবে। প্রথমে আমি ঘি দিয়ে শুরু করি, কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে আমি ওখানেই ছোট একটি কারখানা দেই। সেই খাঁটি ঘি-ই আমরাক্রেতার কাছে পৌঁছে দেই। মধুর ক্ষেত্রে আমাদের আরো বেশি সতর্ক থাকতে হয়েছে। সুন্দরবন থেকে আমাদের নিজস্ব মৌয়ালের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করি। ঘি ও মধু নিয়ে আমাদের রয়েছে ১০০ ভাগ নিশ্চয়তা, তাই এতে থাকছে মানি ব্যাকগ্যারান্টি। কারো যদি পছন্দ না হয় অথবা ভালো না লাগে, তবে ফেরত দিয়ে পুরো টাকা নেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।



পণ্যের ডেলিভারির বিষয়ে হাসান বলেন, সাতক্ষীরাশপের মাধ্যমে যে কেউ পণ্যগুলো কিনতে পারবেন। যেকোনো পণ্য অর্ডার করলেই সাথে সাথে নিজস্ব ডেলিভারিম্যানের মাধ্যমে তা হোম ডেলিভারি দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। চাইলে যেকেউ পণ্য দেখেও নিতে পারবেন। তবে ডেলিভারি ব্যাপারটা চ্যালেঞ্জের। বিশেষ করে হোম ডেলিভারির ক্ষেত্রে। আমরা সারাদেশেই ডেলিভারি করে থাকি। ঢাকার বাইরে ডেলিভারির ক্ষেত্রে এস এ পরিবহনের কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহারকরি। এছাড়া ঢাকার ভেতরে ডেলিভারির জন্য আমাদের নিজস্ব কিছু ডেলিভারিম্যান আছে, আবার কিছু ডেলিভারি কম্পানির মাধ্যমেও ডেলিভারি করে থাকি।


সাতক্ষীরাশপে বেশির ভাগই পেমেন্ট হয় ক্যাশ অন ডেলিভারি। এছাড়াও রকেট ব্যাংকিং, মাস্টার কার্ড, ভিসা কার্ড ইত্যাদির মাধ্যমে পেমেন্টের ব্যবস্থা রয়েছে। ক্রেতা যেভাবে সুবিধা মনে করেন সেইভাবেই পেমেন্ট করতে পারেন।


বর্তমানে সাতক্ষীরাশপডটকম সাতক্ষীরার স্থানীয় পণ্যের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলার স্থানীয় পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করছে বলেও জানান এই উদ্যোক্তা। সাতক্ষীরার ঘি, সন্দেশ, সুন্দরবনের মধু, চিংড়ি এবং স্থানীয় হস্তশিল্পগুলোকে সারাবিশ্বে পৌঁছে দেয়ার স্বপ্ন দেখেন এই স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তা।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com