ই-কমার্সের মাধ্যমে সমাজসেবা করতে চান নেয়ামত উল্যাহ মহান
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০১৭, ১৮:০৫
ই-কমার্সের মাধ্যমে সমাজসেবা করতে চান নেয়ামত উল্যাহ মহান
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

জীবনে কী হতে হবে সেটি বোঝার আগেই শৈশবে বাবা-মার মুখে শুনি, বড় হয়ে আমাকে ডাক্তার হতে হবে। মাধ্যমিক পর্যন্ত সেটিই ছিল আমার স্বপ্ন। মাধ্যমিকের পর একটি সমাজসেবামূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করি। মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখি, ভালো কিছু করতে হলে সমাজের নীতিনির্ধারকদের পছন্দমতো কাজ করতে হয়। কথাগুলো বলছিলেন ই-কমার্সের উদ্যোক্তা নেয়ামত উল্যাহ মহান।


তিনি বলেন, তখন থেকেই মনের ভেতর আরেকটি স্বপ্ন উঁকি দিতে শুরু করে। সমাজের জন্য যারা কাজ করতে চায়, তাদের নিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করব। উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফলে অবশ্য ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা ওখানেই শেষ হয়ে যায়। মাথায় চাপে ই-কমার্স উদ্যোক্তা হওয়ার ভূত। শুরু হয় উদ্যোক্তা জীবনে পথ চলা।


সম্প্রতি বিবার্তার সঙ্গে কথা বলেন নেয়ামত উল্যাহ মহান। বলেন নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ই-কমার্স উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প। বিবার্তার পাঠকদের ওই গল্প জানাচ্ছেন উজ্জ্বল এ গমেজ


কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার ছনুয়া গ্রামে জন্ম এই তরুণ উদ্যোক্তার। প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া মহান বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করছেন।



৭ম-৮ম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় মোবাইল দিয়ে এইচটিএমএল, সিএসএস দিয়ে মোবাইল সাইট ডিজাইন করতেন মহান। তখন তিনি জানতেন না যে, এটি একটি অনেক বড় কাজের প্ল্যাটফর্ম। মাধ্যমিকে পড়ার সময় এবং পরে কুমিল্লায় কয়েকটি ট্রেনিং সেন্টারে মাইক্রোসফট অফিসের ট্রেইনার হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি কয়েকটা প্রিন্টিং প্রেসে গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ করে পড়াশোনাসহ প্রয়োজনীয় খরচ চালাতেন।


মাধ্যমিকে পড়াশোনার সময় থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের প্রতি বিশেষ তাগিদ অনুভব করেন মহান। তখন থেকেই তিনি টেকটিউন্স, পিসিহেল্প লাইনবিডিসহ বিভিন্ন বাংলা-ইংরেজি ব্লগে দিনরাত পড়ে থাকতেন। উচ্চমাধ্যমিকের পরে এগুলোর প্রতি তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। তখন তিনি ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।


মহানের ভাষায়, উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায় নিজে কিছু কারার ইচ্ছাটা জন্ম নেয়। আর সেটিই পরে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পরিণত হয়।


উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে মহান জানালেন, কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে গণিত বিষয়ে ভর্তি হই। পরদিনই এক বড় ভাই আমার সিভি চান। তখন সেটি সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠাই। তার দু’দিন পরেই আমাকে ইন্টারভিউতে ডাকা হয়। প্রায় ঘন্টাখানেক ইন্টারভিউ নেয়ার পর সাথে সাথেই আমাকে কম্পিউটার অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।


সুন্দরবন কুরিয়ারে চাকরি করার সময় এক বন্ধুর সাথে ফেসবুকে একটি ই-কমার্স সাইট শুরু করি। সেটির সুবাদে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সভাপতি রাজিব ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। প্রথমে মনে হয়েছিল ই-ক্যাব রাজিব ভাইয়ের কোনো প্রতিষ্ঠান। পরে বুঝতে পারি এটি একটা ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন। শুরু হয় ই-ক্যাবের সাথে পথ চলা। ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবে সেই ই-কমার্স সাইটই প্রথম উদ্যোগ, বলেন মহান।


সুন্দরবন কুরিয়ারে কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ১৪ মাসের মাথায় চাকরিটা ছেড়ে দেন মহান। মাথায় চেপে বসে ই-কমার্স বিজনেস। পড়াশোনা শুরু করেন ই-কমার্স বিজনেস নিয়ে। ই-ক্যাবে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতে থাকেন। এক সময় তিনি ই-ক্যাব ব্লগ প্রায় মুখস্থ করে ফেলেন। এরপর ই-ক্যাবের একটি সদস্য কোম্পানির ই-কমার্স সাইট তৈরির কাজ পান।


মহান বলেন, ই-ক্যাবের মাধ্যমে পরিচয় হয় তাসদিখ ভাইয়ের সাথে। উনার সাথে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপো ২০১৫’ এর ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজ করি। এরপর থেকেই তাসদিখ ভাইয়ের সাথে উনার কোম্পানিতে কাজ শুরু করি। অন্যদিকে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হই। পড়াশোনা ও কাজের চাপে প্রথম উদ্যোগ ই-কমার্স সাইট থেকে সরে আসি।


তাসদিখ ভাইয়ের সাথে কাজ করার কয়েক মাসের মাথায় উনার কোম্পানি কিনে নেয় কম্পিউটার সোর্স লিমিটেড। তখন উনার সাথে কম্পিউটার সোর্সের ই-কমার্স বিভাগে ই-বিজনেস ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেই। এর মাঝে ব্যক্তিগতভাবে আরও কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কাজ করি, বলেন অদম্য এই উদ্যোক্তা।


মহান জানালেন, ব্যক্তিগতভাবে কাজ করার কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকগুলো কাজই করা হয়নি। তাই ২০১৫ শেষ দিকে ই-কমার্স বিজনেস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি হিসেবে শুরু করি নিজের প্রতিষ্ঠান ‘নুসরাটেক’। শুধু ই-কমার্স সার্ভিসকে কেন্দ্র এটিই প্রথম কোম্পানি বলে দাবি মহানের।


নুসরাটেকের মাধ্যমে ই-কমার্স ব্যবসায়ের বিভিন্ন সেবা দেয়া হয়। কাজের পরিমাণ বেড়ে গেলে এটিকে আরো বড় পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে কম্পিউটার সোর্স থেকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি ব্যবসায় মনোযোগ দেন মহান।


এছাড়াও রাজিব ভাইয়ের সাথে মিলে অনুপ্রেরণামূলক প্ল্যাটফর্ম ‘একারেজবিডি’ এবং ইংরেজি শেখার প্ল্যাটফর্ম ‘সার্চ ইংলিশ’ শুরু করেন। সার্চ ইংলিশ এখন ফেসবুকে জনপ্রিয় গ্রুপগুলোর একটি। বর্তমানে এখানে দেশ-বিদেশের প্রায় এক লাখ ৫৩ হাজার সদস্য রয়েছেন। ইতোমধ্যেই ই-কমার্সের উপর গবেষণা ও উন্নয়ন নিয়ে ‘সেন্টার ফর ই-কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তারা।


‘সার্চ ইংলিশে’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা মহান জানালেন, ই-ক্যাবের সাথে সংযুক্ত হওয়ার পর থেকেই রাজিব ভাইয়ের সাথে বিভিন্ন কাজে প্রতক্ষভাবে অংশগ্রহণ করতে থাকি। আবুল খায়ের ভাইও কাজ করতে থাকেন রাজিব ভাইয়ের সাথে। রাজিব ভাই ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, শিক্ষকতা করেছেন। উনি সব সময় আমাকে আর খায়ের ভাইকে বলতেন ‘আপনারা টেকনিক্যাল ভালো বুঝেন, আর আমি ইংরেজি, এই দুটা মিলিয়ে কিছু একটা করা গেলে ভালো হতো’।


সেই চিন্তা থেকেই রাজিব ভাই, আমি, খায়ের ভাই, মেহেদি হাসান পার্থ ভাই মিলে ২০১৬ সালে এপ্রিল থেকে ‘সার্চ ইংলিশ’ শুরু করি। এর আগে আমরা আরো কয়েকটি মাধ্যমে ভিন্ন নামে চেষ্টা করেছি। সবশেষে ‘সার্চ ইংলিশ’ মডেলটিকে দাঁড় করিয়েছি। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজেই ইংরেজি শেখাকে জনপ্রিয় করে তুলতেই আমাদের এই উদ্যোগ।


মহান বলেন, মজার ব্যাপার হলো বয়সের তুলনায় আমাকে সাইজে অনেক ছোট দেখায়। শুরুতে এটি আমার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, এখনো আছে। নতুন কোনো জায়গায় গিয়ে নিজেকেই উপস্থাপন করতেই আমাকে অনেক বেকায়দায় পড়তে হয়। এছাড়া দিন-রাত নিয়মিত কাজ করে যাওয়া, কি করছি সেটা অন্যদেরকে বোঝানো, অর্থসংকটসহ ছোটখাট আরও কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় প্রতিদিন।


বর্তমানে নুসরাটেক থেকে ই-কমার্স এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কিছু এন্টারপ্রাইজ সল্যুশান নিয়ে কাজ করছেন এই উদ্যোক্তা। আশা করছেন শিগগিরই সেগুলো বাজারে নিয়ে আসবেন।


অন্যদিকে ‘সার্চ ইংলিশ’কে একটি বিশ্বমানের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। সেইসাথে সেন্টার ফর ই-কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট থেকে ই-কমার্সের ওপর বেশ কিছু গবেষণা কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন।


তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আওতায় বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন লিভারেজিং আইসিটি ফর গ্রোথ, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড গভার্ন্যান্স প্রজেক্টের (এলআইসিটি) অধীনে ‘এফটিএফএল ট্রেনিং’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ প্রকল্পে ম্যানেজমেন্ট কনসাল্ট্যান্সি সার্ভিসেস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধানে ই-ক্যাব কর্তৃক আয়োজিত প্রথম ‘ই-কমার্স উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ’ কর্মসূচিতে ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটরের ট্রেইনার ছিলেন মহান। সিলেবাসটি তার করা ছিল। এটি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিমার্জিত হয়ে চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়। এছাড়াও ট্রেনিংয়ের ৬৪ টি বিষয়ের মধ্যে ৯টি কন্টেন্ট লিখেছেন তিনি।


দেশে উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা সম্পর্কে মহান বলেন, ক্যারিয়ার হিসেবে উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা নির্ভর করে একজন উদ্যোক্তা কি নিয়ে কাজ করছেন। উনার উদ্যোগ সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় কিনা বা এটি কোনো বিশেষ সমস্যার সমাধান করছে কিনা এবং বাজারে এর চাহিদা কেমন। যদি এই বিষয়গুলো ইতিবাচক হয়, তাহলে অবশ্য ক্যারিয়ার হিসেবে উদ্যোক্তাদের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।


ই-কমার্সের প্লাটফর্মে তার কোম্পানি থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী হিসেবে জনগণকে বিভিন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বলে জানালেন এই উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, এছাড়াও আমি ব্যক্তিগতভাবে ই-ক্যাবের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছি। আমার পরিকল্পনা হলো, ই-কমার্স সেবাকে উন্নত করতে গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সেবায় যথাসম্ভব নিজেকে বিলিয়ে দেয়া।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com