রাজনীতিবিদ নয়, শুধু একজন লেখক হতে চাই...
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৫:৫০
রাজনীতিবিদ নয়, শুধু একজন লেখক হতে চাই...
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

শাহআলম সাজু একজন কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক। কাজ করেন ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এ। দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখিও করছেন তিনি। প্রত্যেক বছর একুশে বইমেলায় তার একাধিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এবারের মেলায়ও তার লেখা কয়েকটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। বিবার্তা২৪ডটনেটের সঙ্গে শাহআলম সাজুর জীবনের নানাদিক দিয়ে আলাপ হয়।


সাজু জানান, এবারের বইমেলায় তার ছয়টি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হলো : ‘মনে রেখো সন্ধ্যাতারা আমিও ভালোবেসেছিলাম’। বইটি প্রকাশ করেছে অনন্যা। ‘তুমি বৃষ্টিময়ী’ প্রকাশ করেছে অনিন্দ্যপ্রকাশ। ‘বসন্তে এসো তুমি ভালোবাসা দিব’ বইটি প্রকাশ করেছে শব্দশিল্প। ‘গোয়েন্দা অভিযান’ প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। ‘জনি গোয়েন্দা’ প্রকাশ করেছে অন্বেষা প্রকাশন। ‘ভয়ংকর বাবলু’ প্রকাশ করেছে চারুলিপি।


তিনি বলেন, বড়দের জন্যই প্রথম লিখতে শুরু করি। অনেক পরে এসে ছোটদের জন্য লিখতে শুরু করি। ছোটদের জন্য প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসের নাম ‘চার বিচ্ছু’। এটি প্রকাশ করেছিল অন্বেষা প্রকাশন। তবে আমার আসলে লিখতেই বেশি ভালো লাগে, তা হোক ছোটদের কিংবা বড়দের।


প্রথম বই প্রকাশের গল্পটি জানতে চাইলে সাজু বলেন, তখন আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এসময় বাংলাবাজারে প্রায়ই ঘুরে বেড়াতাম একটি বই প্রকাশের আশায়। কত যে ঘুরেছি, কেউ আমার বই ছাপাতে রাজি হতো না। এমনি করে তিন বছর ঘুরে ১৯৯৮ সালে আমার লেখা প্রথম উপন্যাস ‘বৃষ্টিভেজা ভালোবাসা’ প্রকাশিত হয়।


সাজু বলেন, আমি মৌসুমি লেখক নই, নিয়মিত লিখি। মেলা আসবে আর বই লিখব, অমন লেখক হতে চাই না। আমি সারা বছর লিখি। লেখালেখিই আমার সবকিছু। এছাড়া নিজেকে ভাবতেও পারি না।


জীবনের প্রথম পড়া বইটি সম্বন্ধে তিনি বলেন, জীবনের প্রথম পড়া বইটি ছিল রোমেনা আফাজের একটি উপন্যাস। নাম ছিল ‘জানি তুমি আসবে’। তখন আমি স্কুলে পড়ি। গ্রামের বাড়িতে রাত জেগে বইটি পড়ে অনেক কেঁদেছিলাম ।


লেখালেখিতে কীভাবে এলেন জানতে চাইলে সাজু বলেন, আমি মনে করি, নিয়তিই এটা ঠিক করে দিয়েছেন। আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি, আল্লাহকে বিশ্বাস করি। তিনিই সবকিছু নির্ধারণ করে দিয়েছেন।


তিনি আরো বলেন, এক সময় ছাত্ররাজনীতি করেছি, শখের বশে অভিনয়ও করেছি। আবার ইউরোপে সেটেলড হতে চেয়েছিলাম, হলো না শেষ পর্যন্ত। জীবনে কোনোদিনও সরকারি চাকরির চেষ্টা করিনি। শুধু লিখছি, সারাজীবন লিখেই যেতে চাই ।


প্রিয় লেখক কারা জানতে চাইলে সাজু বলেন, আমার প্রিয় লেখক একজন নন, অনেক। হূমায়ুন আহমেদ আমার অসম্ভব প্রিয় একজন লেখক। আবার ইমদা্দুল হক মিলনও আমার প্রিয়। সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু, জহির রায়হান এবং শাহরিয়ার কবিরের সব লেখা আমি পড়েছি। আরো অনেকেই আছেন ।


কথাসাহিত্যের কারিগর হলেও শাহ আলম সাজু কবিতাও ভালোবাসেন। তিনি বলেন, আমি কবিতা লিখতে পারি না, কিন্ত প্রচুর কবিতা পড়ি। আমার প্রতিটি সকাল শুরু হয় কবিতা পড়ে। জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতা হলেও দিনে পড়ি। হেলাল হাফিজের কবিতা বার বার পড়ি।


এখন কোন বইটি পড়ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সাজু বলেন, আনিসুল হকের নতুন উপন্যাস ‘প্রিয় এই পৃথিবী ছেড়ে’ পড়ছি এখন। যতটুকু পড়েছি, অসম্ভব ভালো লেগেছে।


তিনি বলেন, বই না পড়ে একটি রাতও আমি ‍ঘুমোতে যাই না। একটি পৃষ্ঠা হলেও পড়ি।


সাজু জানান, একুশে বইমেলার সঙ্গে তার অনেকদিনের স্মৃতি জড়িত। তিনি বলেন, ঢাকায় এসেছি ১৯৯৬ সালে। ১৯৯৭ সাল থেকে বইমেলার সাথে আমার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। প্রতি বছর বইমেলার অপেক্ষায় থাকি, আর প্রতিদিন মেলায় যাই। নিজের বই প্রকাশ হয়নি, তারপরও বইমেলায় যাওয়া থেমে থাকেনি। একুশের মেলার সাথে আমার আবেগ, ভালো লাগা, ভালোবাসা সবকিছু জড়িয়ে আছে।


এবারের মেলায় তার প্রকাশিত বইগুলো থেকে দুটি বই নিয়ে বলতে বলা হলে তিনি বলেন, প্রথমেই বলতে চাই, ‘মনে রেখো সন্ধ্যাতারা আমিও ভালোবেসেছিলাম’ বইটি নিয়ে। এটি একটি প্রেমের উপন্যাস, সেই সাথে জীবনের গল্পও আছে। এই উপন্যাসে বসন্তকালকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। পাঠকরা পড়ে আনন্দ পাবেন। দ্বিতীয়ত বলতে চাই ‘তুমি বৃষ্টিময়ী’ উপন্যাসটি নিয়ে। এ উপন্যাসটিতে আমার সমস্ত আবেগ ঢেলে দিয়েছি। বৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা, সুন্দর করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সবশেষে তুমি বৃষ্টিময়ী উপন্যাসে আছে ভালোবাসার গল্প, বিরহের গল্প।


‘ফেল্টু বাহিনী’ নামে লেখকের একটি জনপ্রিয় সিরিজ সম্বন্ধে জানতে চাইলে সাজু বলেন, ফেল্টু বাহিনী সিরিজের প্রথম বইটি তাম্রলিপি থেকে প্রকাশিত হয়। বইটির প্রথম মুদ্রণ প্রথম বছরেই শেষ হয়ে যায়। তারপর প্রকাশকের সাথে একটি মৌখিক চুক্তি হয়। পরের বছর প্রকাশিত হয় সিরিজটির দ্বিতীয় বই ‘ফেল্টু বাহিনীর রেকর্ড’। এটিও পাঠকদের মাঝে সাড়া ফেলে। পরের বছর প্রকাশিত হয় ‘ভূতের রাজ্যে ফেল্টু বাহিনী’ নামের বই। সেই সময়ে অবরোধ চলাকালীন এই বইটি প্রথম মুদ্রণ শেষ হয়ে যায়, দ্বিতীয় মুদ্রণ আসে। তারপর এই সিরিজের বই আসে, ওই বইটির নাম : ‘দুঃসাহসী ফেল্টু বাহিনী’।


তিনি জানান, ফেল্টু বাহিনী সিরিজের কোনো বই এ বছর আসেনি।তবে প্রকাশক বলেছিলেন এ বছর আসবে। আসলে প্রকাশক চাননি বলেই লিখিনি, কিন্ত প্রচণ্ড খারাপ লেগেছে। আমি চেয়েছিলাম, ‘ফেল্টু বাহিনী’ সিরিজটি অনেকদিন চালিয়ে যাব। প্রকাশক কেন করলেন না, জানি না।


সাজু জানান, পাঠক সৃষ্টির জন্য তিনি ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ শুরু করেছেন। ‘আলোকিত সখীপুর’ শ্লোগান নিয়ে নিজ উপজেলা সখীপুরের প্রতিটি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কাছে যেতে চান বই নিয়ে। তিনি বলেন, স্বপ্ন থাকলেও সামর্থ কম, তাই আস্তে আস্তে যাচ্ছি। শিশুদের হাতে বই তুলে দেয়ার কাজটি সারাজীবন করে যাব ।


সাংবাদিকতা পেশায় কেমন লাগছে – এ সম্বন্ধে সাজু বলেন, গ্রাম থেকে উঠে আসা এই আমি দেশের এত বড় পত্রিকায় সাংবাদিকতা করছি, এটা আমার জন্য বড় পাওয়া। আমার চাওয়া কম, আমি অল্পতেই তৃপ্ত। কাজের প্রতি ভালোবাসা, সততা ও পরিশ্রম আজকে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।


রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক সময়ে ছাত্ররাজনীতি করেছি। কাছের মানুষরা জানতে চান, ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে নাম লেখাব কিনা। রাজনীতি আমাকে টানে না। রাজনীতিবিদ নয়, বাংলা ভাষার একজন লেখক হতে চাই। লেখা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে চাই। যিনি রাজনীতি করেন ওটা তার জন্য, আমার জন্য লেখালেখি।


সাজুর গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে। গ্রামের সুন্দর পরিবেশে কেটেছে তার ছেলেবেলা।


নিজের পারিবারিক জীবন সম্বন্ধে তিনি জানান, তার স্ত্রীর নাম ফিরোজা। তাদের দুই সন্তান – ছেলের নাম স্বপ্নীল। ছোটটি কন্যা, ওর নাম সারাহ।


লেখক-সাংবাদিক হিসেবে এতদূর আসার পেছনে কার অবদান বেশি জানতে চাইলে সাজু তার মায়ের কথা কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করেন। বলেন, মায়ের জন্যই পড়ালেখা করতে ঢাকা শহরে আসতে পেরেছিলাম। তাঁর জন্যই প্রথম বই প্রকাশ করতে পেরেছিলাম। মাকে কতটা ভালোবাসি তা বলে শেষ করা যাবে না। মায়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই, যেন আমার মা বহু বছর বেঁচে থাকেন, সুস্থ থাকেন।


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com