১৭ বছর ধরে আইটি সেক্টরে আলো ছড়াচ্ছেন রেজওয়ানা খান
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২২, ১০:৫৪
১৭ বছর ধরে আইটি সেক্টরে আলো ছড়াচ্ছেন রেজওয়ানা খান
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

বাবা আলী আকবর খান ছিলেন আইটি ব্যবসায়ী। ২০০০ সালের শুরুতে দেশের যে কয়জন পথিকৃৎ আইটি ব্যবসায়ী ছিলেন, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রতিদিন রুটিন মাফিক একহাতে নিজের মতো করে ব্যবসার সব কাজ সামলাতেন। শৈশবে এভাবে বাবাকে দেখে বড় হয়েছেন রেজওয়ানা খান। বাবার আইটি ব্যবসার প্রতি আন্তরিকতা, আত্মনিবেদন, একনিষ্ঠতা, কঠোর পরিশ্রম তার শিশু মনে দোলা দিত। তখন থেকেই আইটির প্রতি ভালোলাগা শুরু। সময়ের আবর্তে সেই ভালোলাগা পরিণত হয় ভালোবাসায়। এখন আইটিই তার ধ্যান-জ্ঞান। উত্তরসূরি হিসেবে দেখাশোনা করছেন বাবার আইটি ব্যবসা। এই প্রতিষ্ঠান থেকে ৩০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীকে আইটি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।


বলছিলাম,স্টার কম্পিউটার সিস্টেম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ উইম্যান ইন টেকনোলজির (বিডাব্লিউআইটি) সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ানা খানের কথা।দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আইটি সেক্টরে আলো ছড়াচ্ছেন আত্মপ্রত্যয়ী এই সফল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী।



ক্যারিয়ার জীবনের শুরু থেকেই আইটি ব্যবসা নিয়েই তার ধ্যান-জ্ঞান। সফটওয়্যার টেকনোলজিতে উচ্চশিক্ষা নিয়ে শুরু করেন সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কনসালটিং। সেসাথে দেশের নারীদের আইটি ক্যারিয়ার উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাই আইটি সেক্টরে আইটিপ্রেমীদের কাছে তিনি আজ আইকন। হাজারো নারীর স্বপ্নের কারিগর, মেন্টর, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, পরামর্শক এবং বিনিয়োগকারী।



ব্যবসার পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন একাধিক কোম্পানি। আইটি সেক্টরে বেশ কয়েকটি ভালো উদ্যোগ নিয়ে ছুটে চলেছেন স্বপ্নবাজ এই উদ্যোক্তা। নিজের প্রতিষ্ঠানে গড়ে তুলেছেন একদল দক্ষ কর্মী বাহিনী।তার এই সফলতার দীর্ঘ পথপরিক্রমার বাঁকে বাঁকে রয়েছে নানান ঘটনা।



বিজ্ঞান বিভাগ থেকে কৃতিত্বে সাথে এসএসসি পাস করেন রেজওয়ানা। স্কুলজীবনে সুযোগ পেলেই বাবার অফিসে যেতেন। কীভাবে বাবা কি করেন, সব খুঁটিনাটি বিষয় মনোযোগ দিয়ে দেখতেন। তখন থেকেই চিন্তা করতেন বাবার মতো ব্যবসায়ী হবেন।রেজওয়ানা বলেন, বাবা ছিলেন একজন আত্মনিবেদিত, সুদক্ষ ও আদর্শ ব্যবসায়ী। মানুষ হিসেবে যেমন ভালো, তেমনি তার ব্যবসার প্রতিও ছিল অকৃত্রিম ও অগাধ ভালোবাসা। মনপ্রাণ দিয়ে ব্যবসা দেখভাল করতেন। বাবার এই বিষয়টা আমাকে মুগ্ধ করতো। তখন সিদ্ধান্ত নেই বাবার মতো আইটি ব্যবসায়ী হওয়ার।


দুরন্ত কিশোরী। দুচোখ ভরা রঙিন স্বপ্ন। একদিন অনেক বড় আইটি ব্যবসায়ী হবেন। শুধু মুখে বললেই তো হবে না। নিজেকে সে মতো যোগ্য ও দক্ষ করে তুলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন অনেক পড়াশোনার। স্বপ্ন বাস্তবায়নে ভর্তি হন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে কম্পিউটার সায়েন্স (সিএসসি) শেষ করেই ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়া থেকে সফটওয়্যার সিস্টেম ডিগ্রি নেন। আইটি বিষয়ে জানার আগ্রহ আরো বেড়ে যায় তার। শেখার নেশায় ভর্তি হন সেখানকার দ্য ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ে অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে। অর্জনের ঝুলিতে যোগ হলো মাস্টার্স ডিগ্রিও। এরপর ইউনিভার্সিটি অব সাউর্দান কুইন্সল্যান্ড থেকে ইমপাওয়ার উইম্যান থ্রট ইন্টারপ্রেনিয়ারশিপ অ্যান্ড বিজনেসে ফেলোশিপ অর্জন করেন স্বপ্নবাজ রেজওয়ানা।



প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের পর সেই জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের পালা। যোগ দেন বাবার প্রতিষ্ঠানে। বাবার হাত ধরেই ব্যবসায় হাতেখড়ি তার। নিজেদের প্রতিষ্ঠান হলেও ২০০২ সাল থেকে ২০০৪ সাল, দুই বছর ১ মাস প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করেন। এরপর ২০০৪ থেকে ১ বছর ৪ মাস তিনি প্রতিষ্ঠানের বিজনেস অ্যান্ড সিস্টেম অ্যানালিস্ট হিসাবে কাজ করেন। বাবা পরম যত্নে মেয়েকে গড়ে তোলেন যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে।



রেজওয়ানা বলেন, বাবা আমাকে নিজের হাতে ব্যবসা শিখিয়েছেন। আমার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও শিক্ষা থাকলেও প্র্যাকটিকেল কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। কীভাবে একটা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হয়, দেখভাল করতে হয়, হাতে ধরে তিনি শিক্ষা দিয়েছেন।


বাবার নেতৃত্বে দীর্ঘদিন কাজ করার পর স্টার কম্পিউটার সিস্টেম লিমিটেড প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর অ্যান্ড সিইও পদে যুক্ত হন রেজওয়ানা। এবার স্বপ্ন পূরণের পালা। রেজওয়ানা বলেন, যখন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেই, কাজ করার আগে বিষয়টা যতটা সহজ মনে হয়েছে, বাস্তবে গিয়ে দেখি ততটা সহজ না। অনেক চ্যালেঞ্জিং। সেগুলো নিজের মেধা ও কৌশল দিয়ে অতিক্রম করেছি।




১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৯৮ সালে লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয় স্টার কম্পিউটার সিস্টেমস। ২৮ বছরের বেশি সময় ধরে আইসিটি সেক্টরে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির মূল কাজ এন্টারপ্রাইজ অ্যাপ্লিকেশন ইমপ্লিমেন্টেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কনসালটিং। প্রতিষ্ঠানটি যেসব লেভেলের কোম্পানির কনসালটিং করে এসব প্রজেক্টের সাইজ এবং মূল্যমান কয়েক মিলিয়ন ডলার।



বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানির কনসালটিং কাজ করেন রেজওয়ানার প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি একটা এইচআর রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট সেক্টর আছে তার। বাংলাদেশে এটা ট্রেনিং সেক্টর হিসেবে পরিচিত। এ সেক্টর থেকে ইতোমধ্যেই ৩০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী আইটির বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।


রেজওয়ানা বলেন, আমরা সাধারণত মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কাজগুলোকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। কনসালটিংয়ের জন্য একটা বড় টিম রয়েছে। কনসালটিংয়ে আমরা একদম এন্টারপ্রাইজ লেভেলের সল্যুশন দেই। কোম্পানির বিজনেস প্রসেস বুঝে, প্রসেস রিইঞ্জিনিয়ারিং করে কীভাবে হোল সল্যুশন হবে- এসব দিকগুলোতে গুরুত্ব দেই। আমাদের কাজের বিশেষত্ব হলো, আমরা যে কাজই করি না কেনো, সে কাজ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হয়। কোয়ালিটিতে কোন রকমের কম্প্রোমাইজ করি না।


স্টার কম্পিউটার সিস্টেম শুধু নয়, এর পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে আরো কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে এই উদ্যোক্তার। ইতোমধ্যেই আরো দুইটা ভেঞ্চারের কাজ শুরু করেছেন তিনি। এর মধ্যে একটি, নলেজ বেইজড কোস্পানি। এখানে শুধু নলেজ লেভেলের কাজ করা হবে। অন্যটা, হাই ট্যাকনিক্যাল অ্যাডভান্স লেভেল কোম্পানি। এটা টেকনোলজি ভিত্তিক। এখানে বিশ্বের উন্নত ও সুপার টেকনোলজিগুলো নিয়ে কাজ করা হবে।


তিনি বেশ কিছু সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত। সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজও করছেন নিঃস্বার্থভাবে।বাংলাদেশ উইম্যান ইন টেকনোলজি (বিডব্লিউআইটি) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।নিজের কোম্পানি নিয়ে কাজ করলেও তিনি আইটি সেক্টরে পরামর্শক হিসেবে বেশ পরিচিত।আইসিটি ডিভিশনকে তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি এবং সরকারকে সার্পোট দিয়ে চলেছেন এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। নিজের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান আইটি সেক্টরের উন্নয়নে প্রয়োগ করছেন।দেশের আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো টেকনোলজিতে কিভাবে উন্নত করা যায়, এই বিষয়ে কৌশলগত পরিকল্পনার পরামর্শ, ব্যবসার দলগঠন, ম্যানেজমেন্ট চেঞ্জ সংক্রান্ত কাজ করেন। তিনি পরামর্শ দেন কর্পোরেট বিজনেস পর্যালোচনা বিষয়ক, ব্যবসার প্ল্যানের কাজ সংক্রান্ত সার্পোটও দেন।ব্যবসার যেকোনো পরিবর্তন প্রক্রিয়ার নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ দরকার হলে তিনি তাও করেন। এ ছাড়াও কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্ব, টেক নিয়ে স্টার্টআপদের পরামর্শদাতা হিসেবেও কাজ করেন সংগ্রামী এই উদ্যোক্তা।


যাত্রাটা সহজ ছিল না। নানা বাধাবিপত্তি, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তাকে এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে। এবিষয়ে রেজওয়ানা বলেন, আইসিটি সেক্টরকে অসম্ভব রকমের ভালোবাসি। ভালোবাসি বলেই এই সেক্টরের উন্নয়নে কাজ করছি। আমি মনে করি, এই সেক্টর আমার পরিবার। বাবার ব্যবসা যখন শুরু করি, তখনো আমাকে অনেক পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কাজ করতে গিয়ে নানান প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অনেক বাধা পেরিয়ে এতদূর এসেছি। একজন উদ্যোক্তার জীবনে নানান বাধাবিপত্তি, চ্যালেঞ্জ আসবেই। সব প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। হতাশ হলে সাফল্যের দেখা মিলবে না। আমি মনে করি, নিজেকেই নিজের অনুপ্রেরণা দিতে হবে। কারণ এগিয়ে যাবার জন্য নিজের কাজও প্রমাণ করবে নিজেকে।



গত ২০ বছরে আইটি সেক্টরে নারীদের অংশগ্রহণ অনেকগুণ বেড়েছে। ২০১০ সালেও নারীরা আইটিতে পড়ালেখা শেষ করে এই খাতে আসতে চাইতো না। দেখা গেছে কেউ ব্যাংকে ঢুকে গেছে, কেউ সেলসে বা কেউ অন্য কোনো সেক্টরে। রেজওয়ানা বলেন, আগেও মেয়েরা ভালো করত। তবে সংখ্যাটা খুবই কম ছিল। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে নারীরা আইটিতে পড়ালেখা করছেন। প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তারপর ক্যারিয়ার হিসেবে কেউ অনলাইনে বিজনেস করছেন, কেউ বা উদ্যোক্তা হচ্ছেন। কেউ আবার উদ্ভাবনী কাজ নিয়ে বিজনেস করছেন। আইটিতে নারীর অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে।



ই-গর্ভনেন্স, এন্টারপ্রাইজ, এইচআর রির্সোস এবং ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট নিয়েও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে রেজওয়ানার। সরকারি বেশ কিছু প্রজেক্ট, মন্ত্রণালয়, বহুজাতিক কোম্পানি, দাতাসংস্থা, বৈদেশিক কোম্পানি সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও আছে। তার বিশেষ দক্ষতা আছে এন্টারপ্রাইজ লেভেল প্রজেক্ট অ্যান্ড এইচআর ডেভেলপমেন্ট নিয়ে আইসিটি সেক্টরে কাজের।



আইটিতে ক্যারিয়ার প্রত্যাশী নারীদের সব ধরনের সহায়তা করাই এখন অন্যতম প্রধান লক্ষ্য রেজওয়ানার। যেমন, তাদের দক্ষতা অনুসারে প্রশিক্ষণ দেয়া, গাইডলাইন দেয়া, মেন্টরিং করা, কোনও সমস্যায় পড়লে উত্তরণের পরামর্শ দেওয়া ইত্যাদি। তিনি চান নারীরা আরও বেশি আইটি ক্যারিয়ারে আসুক।


রেজওয়ানা বলেন,স্বপ্ন দেখি দেশের সুপার টেকনোলজি নিয়ে কাজ করার। একদিন ডিজিটাল বাংলাদেশের সব সেক্টর আইটিনির্ভর হবে। যেমন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ব্লকচেইন টেকনোলজি, রোবটিক্স ইত্যাদি দেশের সব সেক্টরে ব্যবহার করা হবে। মানুষের জীবন হবে স্মার্ট ও উন্নত। সেদিন বেশি দূরে না। সে দিনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। সেসাথে দেশের মানুষকেও দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে যাচ্ছি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে আইটি প্রফেশনালস প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমি আমার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আইটি প্রফেশনালস তৈরি করছি।এ কাজ যেন নিরবিচ্ছিন্নভাবে করে যেতে পারি সকলের কাছে এই দোয়া চাই।


বিবার্তা/গমেজ/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com