কলেজে পড়ার পাশাপাশি ফ্রিল্যন্সিংয়ে ৯০ লাখ টাকা আয় ফারজুকের
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২২, ১০:৩৩
কলেজে পড়ার পাশাপাশি ফ্রিল্যন্সিংয়ে ৯০ লাখ টাকা আয় ফারজুকের
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ছোটবেলায় যখন কম্পিউটার দেখতাম, তখন শুধু তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম একটা কম্পিউটার আমার কবে হবে! কবে নিজের করে পাবো এই যন্ত্রটা! নদীর মতো সময়- আজ আমার অনেকগুলি কম্পিউটার। সেগুলি থরে থরে সাজিয়ে রেখেছি। ফ্রিল্যান্সার শিক্ষার্থীরা এসে এগুলো ব্যবহার করেন। নিজে ফ্রিল্যান্সিং করছি আর সারাদেশের আগ্রহী তরুণ-তরুণীদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণও দিচ্ছি। সেই টাকা দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছি। তিন বছর আগে গ্রাম থেকে বাবা-মা, ভাই-বোনদেরকে সিলেট শহরে এনেছি। তাদের সিলেটে ভালো স্কুলে ভর্তি করেছি। গত চার বছরে শুধু ফ্রিল্যান্সিং করেই ৯০ লাখ টাকার মতো আয় করেছি।


এভাবে নিজের জীবনের কথা বলেন ফ্রিল্যান্সিং অ্যাজেন্সি ওয়ান ম্যান সল্যুশনসের প্রতিষ্ঠাতা, সফল ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল মার্কেটার ফারজুক আহমেদ। বর্তমানে আইসিটি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের সিলেট জেলার মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফ্রিল্যান্সিংয়ের পাশাপাশি অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন তিনি।


সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ছেলে ফারজুক। গ্রামের ধুলোমাটি গায়ে মেখে বড় হয়েছেন। ছেলেবেলায় পড়াশোনার প্রতি বেশ মনোযোগী ছিলেন। লক্ষ্য ভালো রেজাল্ট করা। বড় হয়ে এমন কিছু করা যাতে মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা-মায়ের সব দুঃখ-কষ্ট দূর করতে পারেন।



ফারজুকের স্বপ্ন ছিল নিজের একটা কম্পিউটার কেনার। শিখবে, মনের মতো করে চালাবে। মানুষকে শেখাবে। টাকা আয় করবে। পরিবারকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করবে। মধ্যবিত্ত পরিবার- সে স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই ছিল। বাবার কাছে কম্পিউটার কেনার কথা বললে জুড়ে দেন শর্ত। ক্লাসে ফাস্ট হতে হবে, এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো রেজাল্ট করতে হবে। বাবার দেয়া সব শর্তই ফারজুক পূরণ করেছিলেন।


তার ভাষ্য, স্কুল জীবনে সব সময় ভালো রেজাল্ট করেছি। এসএসসি ও এইচএসসিতে এ প্লাস পেয়েছি। কিন্তু বাবার সামর্থ্য ছিল না আমাকে একটা কম্পিউটার কিনে দেয়ার। কেননা আমরা তিন ভাই এক বোন। সবার সব চাহিদা বাবার একার পক্ষে পূরণ করাটা অনেক কঠিন ছিল।


ফারজুকের বাবা প্রবাসে চাকরি করতেন। পরিবারের সবার ইচ্ছে বড় ছেলে ডাক্তার হবে। অনেক বড় চাকরি করবে। একদিন পরিবারের সব দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন দূর হবে। এইচএসসি পাস করার পর পরিবারের ইচ্ছে পূরণ করতে সিলেট মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দেন। বিধি বাম। অকৃতকার্য হন। আর চান্স হলো না তার।


ফারজুক বলেন, মেডিকেলে চান্স পাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি, পাইনি। পরে সিলেট এমসি কলেজের ম্যাথম্যাটিকস ডিপার্টমেন্টে চান্স পাই। অনার্সে ভর্তি হই। ভাবলাম কী করা যায়? বাবার টাকায় তো পড়ছি। এভাবে কতদিন? হঠাৎ একদিন ফেসবুকে দেখি সিলেটে সরকারের লানিং অ্যান্ড আনিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টে (এলইডিপি) অধীনে পরিচালিত প্রফেশনাল আউসোসিং ট্রেনিং কোর্স করানো হবে। আমার তো স্বপ্ন একটা কম্পিউটার কেনার। এমনিতে তো বাবা কিনেই দিলো না। এই কোর্সের শর্ত আগ্রহী শিক্ষার্থীর কম্পিউটার থাকতে হবে। বিষয়টা বাবাকে বলি। এদিকে বাবাতো ফ্রিল্যান্সিং বোঝেন না। অনলাইন থেকে টাকা আসবে এটা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। অনেক করে বোঝানোর পর শেষে কম্পিউটারটি কিনে দেন। আমি ওই আউসোসিং ট্রেনিং কোর্সে ভর্তি হতে যাই। সেখানেও আমাকে নেয়া না, কারণ নিয়োগের সময় পার হয়ে গেছে।



অনেক আগ্রহ নিয়ে প্রথমেই একটা ধাক্কা খেলেন ফারজুক। ক্ষণিকের জন্য মন খারাপ হলেও হতাশ হননি। আবার চেষ্টা করতে থাকেন। সবসময় ফেসবুকে খুঁজতে থাকেন। কোথায় এ ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ফারজুক বলেন, একদিন একটা ফেসবুক গ্রুপে এক বড় ভাইয়ের ফিউচার আইটি ভ্যালি ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে দিনব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং ফ্রি ট্রেনিংয়ের পোস্ট দেখি। রেজিস্ট্রেশন করে সেমিনারে অংশগ্রহণ করি। ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রাথমিক অনেক কিছু শিখি। ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রতি আগ্রহটা বেড়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেই ওখানে ভর্তি হওয়ার। বাধা হয়ে দাঁড়ায় কোর্স ফি। এত টাকা পাবো কোথায়? বাবা তো অনেক কষ্টে কম্পিউটার কিনে দিয়েছেন। তখন বিষয়টি ফিউচার আইটি ভ্যালির কর্তৃপক্ষকে জানালে স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেন তারা।


একদিনের সেমিনারে সফল ফ্রিল্যান্সারদের জীবন কাহিনি, ফ্রিল্যান্সিং কি, কোথায়, কীভাবে, কোন কোন বিষয়ে ফ্রিল্যান্সিং করা যাবে, কেমন আয় হবে ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা লাভ করেন ফারজুক। সে অনুসারে প্রশিক্ষণ নিতে ফিউচার আইটি ভ্যালিতে ভর্তিও হন। বিপত্তি বাধে কোন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিবেন।


ফারজুক বলেন, সেমিনারে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে আমি প্রাথমিক ধারণা লাভ করি। কিন্তু কোন বিষয়ে করবো বুঝতে পারছিলাম না। ওই সময় বন্ধু শাহাদাৎ হোসেন জাহিদ ফ্রিল্যান্সিং করত। ও বললো বন্ধু তুই এই সেক্টরে যেহেতু নতুন, ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে শুরু কর- ভালো করবি। তখন ওর পরামর্শে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করি।


ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে প্রশিক্ষণ চলাকালে ফারজুকের আর্নিং শুরু হয়। তিনমাস প্রশিক্ষণ নেয়ার পর কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি রীতিমতো ইনকান করতে থাকেন তরুণ এই ফ্রিল্যান্সার। বায়ারদের সাথে কাজ করতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতা হয় তার। বুঝতে পারেন কাজে দক্ষ না হলে বড় বড় প্রজেক্টের কাজ করা সম্ভব না। তখন জানার ও শেখার নেশায় ভর্তি হন কম্পিউটার কাউন্সিলের প্রশিক্ষণ কোর্সে।