খেশ পণ্য সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চান নিগার ফাতেমা
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৫:৪০
খেশ পণ্য সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চান নিগার ফাতেমা
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

শৈশবে নিজের জীবনকে নিয়ে সবার কতই না ইচ্ছে থাকে। জীবনের অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে সে ইচ্ছেগুলোর রঙ যায় বদলে। একইভাবে তারও ছোটবেলায় খুব ইচ্ছে হতো বড় হয়ে অনেক বড় চাকরি করে একটা কর্পোরেট লাইফ লিড করার। জীবন চলছিলো আপন গতিতে। পড়ালেখা শেষ করে সোনার হরিণ চাকরিও শুরু করেন। ভাগ্যদেবী তার প্রসন্ন হয়নি। পরে হন দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তা। কাজ করছেন টাঙ্গাইলের তাঁতিদের হাতে বোনা খেশ শাড়ি নিয়ে।


বলছিলাম অনলাইন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা ‘আরিয়াস কালেকশনস’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং কর্ণধার নিগার ফাতেমার কথা। তিনি এখন অনলাইনে সারাদেশে টাঙ্গাইলের তাঁতিদের হাতে বোনা খেশ শাড়ি বিক্রি করছেন। আজ তিনি সফল। এই সফলতা একদিনে আসেনি। সে গল্প জানতে যেতে হবে আরো অনেক পেছনে।



রাজধানী ঢাকার ওয়ারিতে জন্ম নিগার ফাতেমার। বাবা ব্যাবসায়ী। মা গৃহিণী। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। পরে অ্যামেরিকান ইন্টারন্যশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে ইলেকট্রিকাল ও ইলেকট্রনিকস ইন্জিনিয়ারিং বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন তিনি। স্বামী ইঞ্জিনিয়ার। কাজ করেন একটা বেসরকারি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। মেয়ে পড়েন স্কুলে।



মাস্টার্সে পড়ার সময়ে বিয়ে করেন তিনি। নতুন সংসার জীবনের পাশাপাশি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন এবং বেশ কিছুদিন সেইখানে চাকরিও করেন। সন্তান হবার পর তার পক্ষে চাকরিটা কন্টিনিউ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। স্বামী, সংসার ও সন্তান নিয়ে বেশ ভালোই সময় কাটছিলো তার। কিন্তু মনে কোথায় যেনো একটু অভাব বোধ করছিলেন। নিজের একটা আলাদা পরিচিতি তৈরি করার ইচ্ছে হচ্ছিলো। প্রতিদিন বিষয়টা তাকে ভাবাতো। মনে মনে ভাবতেন কী করা যায়। কি করলে নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করা যায়। যে কাজের মাধ্যমে নিজের একটা ক্যারিয়ার তৈরি হবে সেই সাথে সন্তানকেও দেখভাল করতে পারবেন।



ফাতেমা বলেন, ফেসবুকে নিয়মিত ছিলাম। ২০১৯ সালে যুক্ত হই অনলাইনে নারী উদ্যোক্তাদের জনপ্রিয় প্লাটফর্ম উইম্যান অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই) গ্রুপে। সেই সময় পেয়ে যাই আমার মেন্টর ই-ক্যাবের সাবেক ও প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট শ্রদ্ধেয় রাজিব আহমেদ স্যারকে। ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিতে উদ্যোক্তা হবার চিন্তা করেছি, মনে সাহস পেয়েছি স্যারের দিকনির্দেশনায়। তখন উই গ্রুপে স্যার সবাইকে নিয়মিত দিকনির্দেশনা দিতেন। স্যার দেশীয় পণ্যের প্রচার বৃদ্ধির জন্য সবাইকে দেশীয় পণ্য নিয়ে লেখালেখি করার জন্য উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমিও স্যারের কথা অনুযায়ী লেখা শুরু করি। বিভিন্ন দেশীয় পণ্য নিয়ে। টাঙ্গাইলের তাঁতিদের হাতে বোনা বিভিন্ন শাড়ি নিয়ে আমি ছোটবেলা থেকে জানতাম এবং সেইগুলো প্রতিদিন লিখতাম। কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য ছাড়াই এমনিতে একদিন খেশ শাড়ি নিয়ে লিখেছিলাম। রাজিব স্যার বলেছিলেন, খেশ পণ্যটি নিয়ে প্রতিদিন লিখতে এবং এই পণ্যটি কাজ করলে ও টিকে থাকতে পারলে ভালো কিছু হবে। সে কথাটা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তখন আমি সিদ্ধান্ত নেই। খেশ শাড়ি নিয়েই আমার যাত্রা শুরু করবো। এই চিন্তা-ভাবনা থেকেই শুরু করি নিজের উদ্যোক্তার যাত্রা। শুরু হয় আরিয়াস কালেকশনসের শুভ যাত্রা। স্যারের কাছে প্রতিদিন শিখেছি এবং সেইগুলো কাজে লাগিয়েছি। এখনো প্রতিদিন শিখি।



ফাতেমা কাজ করেন টাঙ্গাইলের তাঁতিদের হাতে বোনা খেশ শাড়ি নিয়ে। খেশ শাড়ি অনেকের কাছে অজানা। এই অজানা পণ্যটি নিয়ে লিখছেন, সারাদেশের মানুষকে জানাচ্ছেন। নতুনভাবে খেশ শাড়িটি সকলের মাঝে তুলে নিয়ে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়ে খেশ পণ্যটি তৈরি করা হতো শান্তি নিকেতনে। এই শাড়ি তৈরির পদ্ধতি একটু ভিন্ন, পুরাতন কাপড়ের ফালি দিয়ে তৈরি করা হয় নতুন শাড়ি। ফাতেমা দেশের প্রযুক্তিতে তৈরি খেশ শাড়ি নিয়ে কাজ করছেন। খেশ শাড়ি ঐতিহ্যবাহী এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য। ফাতেমা বিক্রি করছেন খেশ শাড়ির পাশাপাশি, খেশ ওড়না, ব্যাগ, কুশন কভার, ছেলেদের পোশাক, বাচ্চাদের পোশাক, মেয়েদের টু পিস কুর্তি এবং শীতের পোশাক খেশ শাল।



ফাতেমার উদ্যোক্তা জীবনের যাত্রার শুরু থেকে তার পরিবার পাশে ছিলো আর এখনো আছে। তার স্বামী, ননদ, বাবা, চাচা তারা শুরু থেকে সব সময় অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছেন। উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাদের অবদান অনেক বেশি। সেই সাথে তাতী, ক্রেতাদেরর সাহায্য ছিলো। সকলের সহযোগিতা পেয়ে আজ এ অবস্থানে এসেছেন। তাই তিনি সকলকে আন্তরিক ধন্যাবাদ জানিয়েছেন।


উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে বিভিন্ন বাঁধার মুখোমুখি হতে হয়েছে ফাতেমাকে। তিনি বলেন, প্রথমত খেশ শাড়ির ধারণাটি অনেকের কাছে অজানা। সকলের কাছে পণ্যটি পরিচিত করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। পণ্যটি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা এবং সকলকে জানানো। খেশ পণ্যের নতুনত্ব নিয়ে আসার জন্য অনেক স্টাডি করা। তারপরও আমার কাছে মনে হয় দিন শেষে বাঁধাগুলো অতিক্রম করার পর অন্যরকম শান্তি পেয়েছি।



এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের অন্যতম মেন্টর রাজিব আহমেদের বিশেষ ‍ভূমিকা ছিলো। ফাতেমার ভাষ্য, স্যারের পরামর্শগুলো আমার ব্যবসায় খুব কাজে লেগেছে। খেশ পণ্যের কন্টেট ছিলো না। এখন অসংখ্য কন্টেন্ট আছে আমার ওয়েবসাইটে। খেশ শাড়ি এখন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরে ক্রেতা আছে। সব কিছু সম্ভব হয়েছে স্যারের পরামর্শের কারণে। স্যার সবসময় বলেন- নিয়মিত কাজ করে যেতে। এই অনুপ্রেরণামূলক কথা অমাকে কাজে শক্তি যুগিয়েছে।


বাংলাদেশের সকল জেলার পণ্য নিয়ে দেশীয় পণ্যের সিলেবাস তৈরি করেছেন দেশীয় পণ্যের এই উদ্যোক্তা। এখন তিনি সিলেবাসের কাজ করছেন। অনলাইনে আইসিটি নিয়ে পড়ালেখার জনপ্রিয় প্লাটফর্ম ডিজিটাল স্কিলস ফর বাংলাদেশ গ্রুপের মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর সেখানে প্রতিদিন দেশীয় পণ্য নিয়ে লেখালিখি করছেন।



ফাতেমা বলেন, জীবনের অর্জন এখনো অনেক বাকি। তবে আনন্দের বিষয় হলো খেশ পণ্য বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরে পৌঁছাতে পেরেছি। আড়াই বছর ধরে একটি পণ্য নিয়ে টিকে আছি। দেশীয় পণ্যের সিলেবাস তৈরি করেছি। সেটি এখন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি টিচারদের সাথে কথা বলছি। তারা প্রশংসা ও উৎসাহ দিচ্ছেন। সব চাইতে বড় কথা রাজিব স্যার আমার প্রতিটি কাজে প্রশংসা করেন। স্যার নিজে গাইড করেন। স্যারের আইডিয়াগুলো নিয়ে আমি কাজ করছি। ই-কমার্স ও ই-লার্নিংয়ে আমি কাজ করছি এবং প্রতিটি কাজের ফল ভালো আসছে।


উদ্যোক্তা জীবনে আসার পর তার স্বপ্ন দেখার পরিসীমা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। কারণ এই ক্যারিয়ারে স্বাধীনভাবে চিন্তা এবং কাজ করা যায়। ফাতেমা বলেন, আমি স্বপ্ন দেখি খেশ পণ্য আরো সামনে এগিয়ে যাবে। প্রচারের মাধ্যমে দেশ ও দেশের বাহিরে একদিন খেশ-এর ক্রেতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। খেশ পণ্যটি নিয়ে আমি কাজ করছি কিন্তু এই পণ্যটি সামনে এগিয়ে যেতে হলে বিক্রেতার সংখ্যা বৃদ্ধি হতে হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, অন্যন্য দেশীয় পণ্যের মতো এই পণ্যেরও বিক্রেতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের তাঁতীদের হাতে বোনা খেশ পণ্য সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাই। এই পণ্যটির মাঝে আরো নতুনত্ব নিয়ে আসতে চাই। তাতীরা যাতে তাদের কৌশল দিয়ে নানা ধরনের খেশ কাপড় তৈরি করতে পারে, এই স্বপ্ন দেখি।



আমার জীবনের সবচাইতে বড় কাজ দেশীয় পণ্যের সিলেবাস যা আমাকে রাজিব স্যার দায়িত্ব দিয়েছিলো, আমি দুই বছর কাজ করে যাচ্ছি এবং স্বপ্ন দেখি তরুণরা এই সিলেবাসের মাধ্যমে দেশীয় সকল পণ্য নিয়ে জানবে। বিলুপ্ত দেশীয় পণ্যগুলো উঠে আসবে। দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।


বিবার্তা/গমেজ/আশিক

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com