কল্যাণমূলক কাজেই আত্মতৃপ্তি পান কামরুজজামান কামাল
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০১৭, ১৭:৪৫
কল্যাণমূলক কাজেই আত্মতৃপ্তি পান কামরুজজামান কামাল
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

মো. কামরুজজামান কামালের ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে সরকারি চাকরি করার। যে চাকরি করলে সরাসরি জনগণের কাছে যাওয়া যায়, যার মাধ্যমে মানুষের সেবামূলক কাজ করার সুযোগ বেশি থাকে। সেটা হতে পারে ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ বা সরকারি যে কোনো সম্মানজনক চাকরি। ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় দেখতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইয়েরা সবাই পররাষ্ট্র, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ক্যাডার হওয়ার জন্য পড়াশুনা করছেন। তাদের দেখে সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার ইচ্ছেটা আরো বেগবান হয় কামালের।


অবশেষে কামালের সেই ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। বর্তমানে তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের একজন সদস্য হিসেবে মাঠ প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


সম্প্রতি রাজধানীর ফার্মগেটের বাসায় মো. কামরুজ্জামান কামাল কথা বলেছেন বিবার্তা২৪ডটনেটের সাথে। দীর্ঘ আড্ডায় বেরিয়ে আসে তার শৈশব থেকে স্বপ্ন পূরণ এবং জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা। কী সেই ঘটনা? সেই গল্প জানাচ্ছেন উজ্জ্বল এ গমেজ।


ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুস সামাদ ও মা খোদেজা বেগমের পরিবারে জন্ম মো. কামরুজজামান কামালের। বাবা-মা পেশায় ছিলেন শিক্ষক। বর্তমানে দু’জনেই অবসরে আছেন।



মুক্তিযোদ্ধা পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে কামাল জানালেন, তার দাদার ছিল ৫ ছেলে এবং ৪ মেয়ে । যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠেন সবাই। পরিবারের সবাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ মনেপ্রাণে লালন করেন। দেশকে মন থেকে ভালোবেসেছিলেন বিধায় ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আব্বা, মেঝো ও ছোট চাচাসহ তিনজন ঢাকার দোহারে দুই নং সেক্টরে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। বাবা চাচাসহ গ্রামের একদল যুবক সবাই এক সাথে ওই এলাকার কমান্ডার জালালউদ্দিন এবং অপারেশন কমান্ডার সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে ঢাকার দোহার, ফরিদপুরে তিন মাস প্রশিক্ষণ শেষে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বাবার কাছে প্রায়ই শুনি কিভাবে তারা থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে হাজিগঞ্জের থানা (তখনকার পাকিস্তানি ক্যাম্প) আক্রমন করে পাকিস্তানি সেনাদের পরাস্থ করেছিলেন।


শৈশবে কামাল ক্লাস ওয়ান, টুতে পড়াশুনা করেননি। সারাসরি ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হন। নিজে কোনো দিন বই পড়তেন না। শিক্ষক বাবা ও মা বই পড়তেন কামাল তা শুনে সব কিছু মনে রাখতেন। এভাবেই চলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত।


ছোটবেলা থেকেই কামাল ক্লাসের প্রথম সারির ছাত্র ছিলেন। তবে এসএসসিতে ঘটে বিপত্তি। মানবিক বিভাগে চারটি বিষয়ে লেটার মার্কস থাকা সত্ত্বেও ৭৪৭ নম্বর পেয়ে তিন নম্বরের জন্য এসসিসিতে স্টার মার্কস পাননি কামাল। এরপর ইন্টারমিডিয়েট এ ঢাকা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে পাস করেন।


ব্যক্তি হিসেবে কামাল অনেক পরিশ্রমী। ছোটবেলা থেকেই তিনি অনেক পরিশ্রম করেছেন। জীবনের সাথে সংগ্রাম করে বড় হয়েছেন। তার জীবনের প্রথম সংগ্রাম ছিল এসএসসি পাস করার পরে যে কোনো একটা ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া। কারণ চরভদ্রাসনে তেমন কোনো ভাল কলেজ ছিলা না। হয় ফরিদপুর জেলায় বা ঢাকায় কোনো কলেজে ভর্তি হবেন। পরিবারের কেউ তেমন রাজি না থাকলেও শেষে তিনি বাবা ও মাকে বোঝাতে সক্ষম হন এবং ঢাকা কলেজে ভর্তি হন।



তখন তারা এক সাথে চার ভাইবোন পড়াশোনা করেছেন। তিনজন সাইয়েন্সে, আর কামাল শুধু মানবিকে। কামাল কলেজজীবন থেকেই টিউশনি করে নিজের পড়াশুনার খরচ চালাতেন। তিনি বলেন, টিউশনিটা আমার জীবনে অনেক সাহায্য করেছে। আজকে আমি যে ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েছি তার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান টিউশনির। টিউশনির কারণে আমি সবসময় চাকরী সংক্রান্ত পড়ার মধ্যে ছিলাম।


ঢাবিতে পড়ার সময় কামাল পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ও জড়িত ছিলেন। ঢাবিতে সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদে কবিতা আবৃত্তি ও নাটক করেছেন। এর ফলে তার মুখের জড়তা কেটে যায় এবং অনেক বেশি সাবলিলভাবে কথা বলতে শেখেন।


ঢাবিতে ভর্তি হওয়ার সময় তিনি লোকপ্রশাসন, রাষ্টবিজ্ঞান, জার্নালিজম সাবজেক্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু বড় ভাই এবং বন্ধুদের পরামর্শে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার নেশায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে অনার্স এবং মাস্টার্স করেন। এরপর ২৯ তম বিসিএস দিয়ে হয়ে যান বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের সদস্য। বর্তমানে যে পেশায় কাজ করছেন তার সাথে ঢাবিতে নেয়া সাবজেক্টার অনেক মিল খুঁজে পান তিনি।


কামালরা দুই ভাই দুইবোন। পরিবারের পক্ষ থেকে চাওয়া হতো জীবনে যাই হও না কেন ভাল কিছু করো। সম্মান নিয়ে সমাজে চলো। তাই তার পড়াশুনার ক্ষেত্রে তেমন কোনো আপত্তি করেননি পরিবারের পক্ষ থেকে। চার ভাইবোনকে পড়াশুনা করতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তাদেরকে। তবুও কামালের যখন যা প্রয়োজন হয়েছে তখন তাই দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তার পরিবার। জীবনের সাথে অনেক সংগ্রাম করে শেষে গ্রামের মধ্যে দ্বিতীয় ম্যাজিস্ট্রেট হন তিনি।


বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় জয়পুরহাট এবং গাজীপুরে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে, সহকারি কমিশনার (ভূমি) হিসেবে পিরোজপুর সদর ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে দায়িত্ব পালন করেছেন।



কামাল ব্যক্তি হিসেবে একটু কোমল হৃদয়ের মানুষ। কাউকে সহজে দুঃখ দিতে পারেন না। কেউ যদি তার কারণে কোনো কিছুতে কষ্ট বা বঞ্চিত হন তাহলে তিনি রাতে ঘুমাতে পারেন না। সব সময় তিনি সকল দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করতে ভালবাসেন।


বর্তমানে যে দায়িত্ব পালন করছেন এর চ্যালেঞ্জ বিষয়ে কামাল বলেন, এখানকার কাজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, পরিবার থেকে দেশের সেবাতে বেশি সময় দিতে হয়। আমার ধ্যান-জ্ঞান সব কিছুই এখন দায়িত্বকে ঘিরেই পরিচালিত হয়। তবে আত্মতৃপ্তির বিষয় হলো, এই কাজের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগণকে কাছে থেকে সেবা দেয়া যায়। মানুষের মাঝে থেকে তাদের জীবনের কষ্টকে উপলব্ধি করা যায়। সাধারণ মানুষের জন্য কোনো উপকার করলে তাদের মুখে যে তৃপ্তি ও আনন্দের হাসি ফুটে উঠে ওই দৃশ্যটা আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।


সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে কামাল জানালেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের যে অব্যবস্থাপনা ও দুর্ণাম ছিল সেগুলোকে রোধ এবং জনবান্ধব ভূমি অফিস গড়ে তুলতে সারাদেশের এসি (ল্যান্ড) রা কাজ করছে, এক্ষেত্রে আমিও ভূমি অফিসে সুবিন্যস্ত রেকর্ড রুম, সেবাগ্রহিতাদের জন্য অফিস কম্পাউন্ডে বসার জায়গা, হেল্প ডেস্ক, সরকারি অর্পিত সম্পত্তিতে সাইনবোর্ড লাগানো, সরকারি খাস জমি উদ্ধার, সকল তহসিলদারদের বাঁধাকৃত রের্কড হস্থান্তর, অফিস সহায়কদের ড্রেস বিতরণ করেছি। এছাড়া মা ইলিশ রক্ষায় সারারাত ধরে নদীতে অভিযান, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মিষ্টি তৈরি করায় ভ্ৰাম্যমান আদালত পরিচালনাসহ বিভিন্ন জনসচেতনামূলক কাজ করেছি।



সহকারী কমিশনার (ভূমি) এই সেক্টরটা অনেক দিনই অবহেলিত ছিল। কয়েক বছর থেকে তরুণ প্রজন্ম, বিসিএস ক্যাডাররা এ সেক্টরে যারা আসছেন তারা ভাল কাজ করছেন বলে দাবি করছেন কামাল। আগে একটা মানুষ জানতোই না ভূমি সংক্রান্ত কাজটা কোন অফিসে করা হয়। কিন্তু তারা এখন জনগণের কাছে গিয়ে জানিয়ে দিচ্ছেন কোন অফিসের কোন কাজ, কোন কাজটা কীভাবে ও কত দিনে করা সম্ভব।


এ বিষয়ে কামালের ভাষ্য, সব সেক্টরের তরুণ অফিসাররা বরং সেবাটাকেই জীবনের মূলমন্ত্র হিসেবে নিচ্ছেন। আমার আন্তরিক চেষ্টা সাধারণ মানুষ যাতে প্রকৃত সেবাটা পায়। এভাবে সবাই মিলে কাজ করলে দেশ এক সময় আমূল পরিবর্তন হয়ে যাবে বলে কামালের বিশ্বাস।


জীবন সম্পর্কে কামালের ধারণা, কারো মনে যদি কুটিলতা থাকে তাহলে সেটা তার নিজের জীবনে এসে ভর করে। আর ফ্রেশ থাকলে জীবন হয়ে উঠে আনন্দময়।


মানুষের জন্য যে কোনো কল্যাণমূলক কাজ করতে পারলেই নিজের মনে আত্মতৃপ্তি পান কামাল। তাই সমাজের অবহেলিত মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তিনি বলেন, দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে যারা নিতান্ত গবির অবহেলিত তাদের কিছু মানুষকে একটু করতে পারলেই আমার ওই স্বপ্ন পূরণ হবে।


জীবনের এ পর্যায়ে কোনো অতৃপ্তি আছে কি-না এমন প্রশ্নের জাবাবে কামাল বলেন, না নেই। জীবনে আদর্শ বাবা-মা, ভাল পরিবার, চাকরি, বন্ধু-বান্ধব, কলিগ সবই পেয়েছি। সবার আন্তরিক সহযোগিতায় সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আজ এই পর্যায়ে এসেছি। এর জন্য প্রথমে আল্লাহর প্রতি জানাই অশেষ শুকরিয়া। সেই সাথে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ সকল আত্মীয়স্বজন, শুভানুধ্যায়ী ও বন্ধু-বান্ধবদের। এভাবেই পরিবার, বন্ধু, সিনিয়র স্যার সকলের সহযোগিতায় আরো এগিয়ে যেতে চাই আমি।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com