ফাহমিদা মাহজাবিনের স্বপ্ন পূরণের গল্প
প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৭, ১৯:২৯
ফাহমিদা মাহজাবিনের স্বপ্ন পূরণের গল্প
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

অন্যসব পরিবারের মতো ফাহমিদা মাহজাবিনের পরিবারেরও ইচ্ছে ছিল মেয়েকে ডাক্তার বানানোর। কিন্তু মাহজাবিনের ইচ্ছে ছিল ভিন্নতর। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষানুরাগী দাদার জীবনাদর্শ দেখে তার ইচ্ছে ছিল ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার। হাইস্কুলে উঠে আব্বুকে কলেজে শিক্ষকতা করতে দেখে ইচ্ছে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করার।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার সময়ে শিক্ষকদের জীবন দেখে ভাবনার চাকা যায় ঘুরে। জীবন নিয়ে ভাবতে থাকেন কী করা যায়। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেন সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার।


মাহজাবিনের আবাল্যের সে ইচ্ছে শেষ পর্যন্ত পূরণ হলো। বর্তমানে মাহজাবিন কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা উত্তরের অনলাইন প্রজেক্টে ডেপুটি কমিশনারের দায়িত্ব পালন করছেন।


বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কাকরাইল কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের অফিসে ফাহমিদা মাহজাবিন কথা বলেছেন বিবার্তা২৪ডটনেটের সাথে। দীর্ঘ আড্ডায় বেরিয়ে আসে তার শৈশব, স্বপ্ন পূরণ এবং জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা। কী সেসব ঘটনা? সেই গল্প জানাচ্ছেন উজ্জ্বল এ গমেজ।



ফাহমিদা মাহজাবিনের জন্ম দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায়। ডাকনাম নিতা। আব্বা শামসুল রহমান চৌধুরী বীরগঞ্জ সরকারি কলেজের ইংরেজি শিক্ষক আর আম্মু শাহনাজ বেগম চৌধুরী গৃহিনী। দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচি, ফুপুর আদর-যত্নে কাটে তার শৈশবের দিনগুলো। যৌথ পরিবারের মধ্যেই তিন বোন ও এক ভাইয়ের বেড়ে ওঠা। বর্তমানে তিন বোনই সরকারি কর্মকর্তা। ভাই একটা প্রাইভেট কম্পানিতে চাকুরি করছেন।


নিতার দাদারা ছিলেন দুই ভাই। খানসামা উপজেলার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার ও জামিদার বংশ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তারা। ছোট দাদা খুব শিক্ষানুরাগী মানুষ ছিলেন। পড়াশুনার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল তার। এলাকায় কয়েকটি প্রাইমারি, হাইস্কুল ও মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন তিনি। তার সাত ছেলে। ইচ্ছে ছিল সবাইকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর। তবে দু’জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং দু’জন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা করেছেন।


নিতার আব্বু মেধাবী ছাত্র ছিলেন। মেট্রিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করায় দাদার ইচ্ছে ছিল তাকে ম্যাজিস্ট্রেট বানানোর। পরে হলেন কলেজের শিক্ষক। দাদা ও আব্বুর মুখে এসব গল্প শুনে নিতারও ইচ্ছে হতো ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার। সেজন্য ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশুনায় খুব সিরিয়াস ছিলেন।



ছোটবেলায় খুবই বেড়াতে পছন্দ করতেন চঞ্চল স্বভাবের নিতা। সুযোগ পেলেই বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন। কিন্তু যৌথ পরিবারে মেয়েদের বাইরে যাওয়া ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রথা ছিল পরিবার পরিমণ্ডলের মধ্যেই পড়াশুনা, আড্ডা, খেলাধুলা সব কিছু করতে হবে। শুধু ক্লাস করার জন্য স্কুল-কলেজে যাওয়ার অনুমতি ছিল।


বড়রা নিজেদের কাজ ও গল্পগুজব করে সময় কাটাতেন। বাড়িতে সবাই যখন কাজে ব্যস্ত থাকতেন তখন কঠোর নিয়ম ও বিধিনিষেধের বেড়াজাল ভেঙে নিতা কাজিনদের সাথে বাইরে বন-জঙ্গলে চলে যেতেন।


নদী-নালা, খাল-বিল, গাছ-পালা, বন-জঙ্গল, মাঠভরা শস্য দিয়ে ঘেরা নিতার গ্রাম। প্রকৃতি তাকে ভীষণ টানতো। তাই সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন প্রকৃতির কাছে। একদিন প্রচণ্ড বন্যার সময় নিতাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন তার বয়স সাড়ে চার বা পাঁচ বছর। আব্বু সারাদিন কলেজে থাকেন। সন্ধ্যায় বাড়িতে এসে তাকে খুঁজছেন। কোথাও নিতাকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। চারিদিকে থৈথৈ বন্যার পানি। তখন সবাই পুকুরে জাল ফেলে খুঁজে খুঁজে হয়রান। কোথাও নেই। শেষে তাদের কাজের লোক দেখেন, নিতা পাশে চাচার বাড়িতে কাজিনদের সাথে বসে টিভি দেখছেন। তখন কাজের লোক তাকে বললেন, আজ তোর কপালে পিটুনি আছে।



নিতা আব্বুকে বাঘের মতো ভয় পেতেন। বাড়িতে এসে দেখেন আব্বু রেগে আগুন। আজ কপালে বকা আছে। আশেপাশে রক্ষা করার মতো দাদাও নেই। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। নিতা আব্বুর ঘরের পেছনের বারান্দা দিয়ে দোতলায় উঠে অন্ধকারে সিঁড়ির ঘরে ভূতের ভয় উপেক্ষা করে জড়সড়ো হয়ে দেড় ঘন্টা বসে ছিলেন।


পড়াশুনায় নিতা বরাবরই ছিলেন মেধাবীদের দলে। ক্লাস ফাইভ ও এইটে বৃত্তি পান। বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি ও এইচএসসিতে দুইটা বিষয়ে লেটারসহ স্টারমার্কস নিয়ে পাস করেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আব্বু-আম্মুর ইচ্ছা পূরণ করতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেন। শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সফলতার সাথে অনার্স ও এমবিএ সম্পন্ন করেন।


কলেজজীবনটা নিতার গুরুত্বপূর্ণ, বৈচিত্র্যময় ও আনন্দময় ছিল। থাকা-খাওয়া, টাকা-পয়সার কোনো টেনশন ছিল না। বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে ঘুরাফেরা, আড্ডা দেয়া এক অন্যরকম রঙিন জীবন। কিন্তু স্বাধীনভাবে চলাফেরা করলেও নিতা পড়াশুনার ব্যাপারে সব সময়ই ছিলেন সিরিয়াস। সারাদিন যেখানে যা খুশিই করুক না কেন, পড়াশুনাটা করতেন ঠিকমতোই।


নিতার ভাষায়, দাদা ও আব্বুর আদর্শ ছিল পড়াশুনা আগে, তারপরে অন্য কিছু। আমিও তাদেরই আদর্শ অনুসরণ করছি। তাদের দ্বারাই অনুপ্রাণিত হয়েছি। তাই সব কিছুর ঊর্ধ্বে আমার পড়াশুনা।



ঢাবিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভীষণ ব্যস্ততায় সময় পার হতে থাকে। খোলামেলা পরিবেশে বেড়ে ওঠা স্বাধীনচেতা নিতার শুরুতে রোকেয়া হলে মন টিকছিল না। পরে ধীরে ধীরে বন্ধু-বান্ধব সার্কেল তৈরি হলে পুরোদমে কলেজজীবনের মতো উপভোগ করতে থাকেন।


ঢাবিতে এসে মাহমুদুর রহমানকে ভাললাগে নিতার। ভাললাগা থেকে প্রেম, পরে তৃতীয় বর্ষে এসে তা গড়ায় পরিণয়ে। তখন ঢাবির হল ছেড়ে স্বামীর কাছে চলে যান। রাজধানীর উত্তরা থেকে এসে নিয়মিত পড়াশুনা করে অনার্স পাস করেন। কিছুদিন একটা প্রাইভেট কম্পানিতে চাকুরি করে মাস্টার্স না করে এমবিএ শুরু করেন। এরই মধ্যে সন্তান, সংসার সব সামলে স্বামী ও আব্বুর অনুপ্রেরণায় আবার বিসিএস ক্যাডারও হন তিনি।


ছেলে ফাহমিদ রহমান। বয়স আট বছর। রাজধানীর একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ক্লাস টুতে পড়াশুনা করছে। স্বামী মাহমুদুর রহমান মাল্টিন্যাশনাল কম্পানির (বাইয়িং হাউজের) কান্ট্রি ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করছেন।


অবসরে নিতা বই পড়া, টিভি দেখা, ঘুরাফেরা, গ্রামের মানুষের কাছে অলৌকিক ও ভৌতিক গল্প শুনতে পছন্দ করেন। নিতার জীবনে ইচ্ছে সারাবিশ্বের ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার।


স্বপ্ন বিষয়ে তিনি জানালেন, চাকুরির থেকে অবসর নেয়ার পরে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য কল্যাণমূলক কিছু কাজ করতে চান তিনি। তবে কি কাজ করবেন সে বিষয়ে এখন কিছু বলেননি। তিনি বলেন, সময়ই সব বলে দেবে আমি কী করব। একজন মানুষ হিসেবে নিজের অন্তরের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই এই কাজ করবেন বলে জানালেন নিতা। তার এই স্বপ্ন পূরণর জন্য বিবার্তার পাঠকদের দোয়া চেয়েছেন তিনি।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com