আন্তর্জাতিক বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান অহনা
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১৬:৩৪
আন্তর্জাতিক বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান অহনা
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীদের বডিবিল্ডিংয়ের বিষয়টা অনেকেই বাঁকা চোখে দেখেন।একজন নারী মঞ্চে পেশিবহুল শরীর দেখিয়ে পারফমেন্স করবেন বিষয়টাকে কেউ সহজভাবে নেবেন না।এটা নিয়ে সমালোচনা করবেন। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো আমি যখন নারীদের বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেছি তখন এমন ভাবনা কখনই আমার মনে আসেনি। আমি স্বাভাবিকভাবেই অংশগ্রহণ করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।


এভাবেই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের সাথে কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশের বডিবিল্ডিং ফেডারেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত মেয়েদের বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতা ২০১৯ আসরের প্রথম শিরোপাজয়ী ১৯ বছর বয়সী অহনা রহমান।



বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতা ২০১৯ আসরের প্রথম শিরোপাজয়ী অহনা রহমান


২০১৯ সালে ডিসেম্বরের শেষের দিকে রাজধানী ঢাকায় প্রথমবারের মতো তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে নারীদের বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতা। আর এতে ২৯ নারী প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন আত্মপ্রত্যয়ী এই তরুণী।


রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় যেখানে নারীর বডিবিল্ডিংয়ের বিষয়টা অন্য চোখে দেখা হয় সেখানে অহনা বিষয়টাকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিয়েছেন। বডিবিল্ডিংকে তিনি ক্যারিয়ার হিসেবে কেন নিয়েছেন জানতে হলে যেতে হবে তার পেছনের দিনগুলোতে।


ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য মুসলিম পরিবারে বেড়ে উঠা অহনার। বাবা হাফিজুর রহমান হেলথ অ্যান্ড এডুকেশন ফাউন্ডেশন এবং রায়হান স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যান, মা রায়হান স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিন্সিপাল। দুই ভাই-বোনের মধ্যে অহনা ছোট। বড় ভাই রায়হান রহমান। রায়হান ফিটনেস সেন্টারের পরিচালক ও প্রধান প্রশিক্ষক।



রায়হান ফিটনেস সেন্টারে প্র্যাক্টিজ করছেন অহনা


বড় ভাই নিজে বডিবিল্ডিংয়ের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে রায়হান ফিটনেস সেন্টার চালু করেন। এ সেন্টারে নিজে বডিবিল্ডিংয়ের চর্চা করেন এবং তিন শিফটে নারী-পুরুষদের প্রশিক্ষণ দেন।


রাজধানীর ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুল থেকে প্রাইমারি এবং ২০১৮ সালে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপএ৫ পেয়ে পাস করেন অহনা। আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় এইচএসসি পরীক্ষা দেবেন তিনি।


ছোটবেলা থেকেই বড় ভাইকে বডিবিল্ডিংয়ের চর্চা করতে দেখে এসেছেন অহনা। যদিও বাবা-মা এ বিষয়ে কোনো প্রেসার দেননি। তার প্রতি বাবা-মায়ের পরামর্শ ছিল তোমার মেধা আছে, সেটা বিকশিত করো। বড় হয়ে যেটাতে স্বচ্ছন্দ্যবোধ কর সেটাকেই তুমি তোমার ক্যারিয়ার হিসেবে নেবে। এ বিষয়ে কোনো জোর নেই।



বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতায় শারীরিক কসরৎ করছেন অহনা


এসএসসিতে পড়ার সময়ে বড় ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যেতেন অহনা। প্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষের বডিবিল্ডিংয়ের চর্চা দেখে নিজেও নারী হিসেবে বডিবিল্ডার হওয়ার ইচ্ছা জাগে মনে। বিশেষ করে বড় ভাইয়ের প্রতিদিনকার রুটিন করে বডিবিল্ডিংয়ের চর্চা তাকে আকর্ষণ করতো। তখন ভাইকে মনের ইচ্ছার কথা খুলে বললে ভাই তাকে ট্রেনিং দেয়ার দায়িত্ব নেন।


এবিষয়ে অহনা বলেন, আমার বডিবিল্ডিংয়ের ট্রেইনার হলেন বড় ভাই রায়হান। ও নিজে রায়হান ফিটনেস সেন্টার পরিচালনা করেন। আমাদের সেন্টারে দুইজন নারী আর চারজন পুরুষ ট্রেইনার দিনে তিন শিফটে নারী-পুররুষকে ট্রেনিং দিয়ে থাকেন। আমার দায়িত্বে ছিলেন আমার বড় ভাই। শুরু থেকে আমাকে নিজের হাতে তৈরি করেছেন। ভাই আমার আইডল ও অনুপ্রেরণার উৎস।


বডিবিল্ডিংয়ের জন্য একজন নারীকে শুরুতে কি ধরনের শারিরীক চর্চা করতে হয় জানতে চাইলে অহনা জানান, প্রথমে হালকা (ফ্রি হ্যান্ড) ব্যায়াম দিয়ে শুরু করতে হয়। নিজের প্রতি মনোযোগটা এখানে খুব জরুরি। ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়ামের মধ্যে প্রথম দিকে দৌড়, কোমর ঘোরানো, হাত ঘোরানো, স্কিপিং, সাইক্লিং, পেটের মেদ কমানোর হালকা ব্যায়ামগুলো করতে হয়। এরপর আস্তে আস্তে যেতে হবে ভারী ব্যায়ামের দিকে। আর সেই সঙ্গে দরকার পড়ে একটা পরিপূর্ণ খাদ্যতালিকার। আর পেশি গড়তে হলে শুরুতে পাঁচ থেকে ছয় মাস সাধারণ ব্যায়াম করতে হয়। এরপর ধীরে ধীরে কষ্টকর ব্যায়ামগুলো করতে হয়। প্রথম দিকে একটু পরিশ্রম হলেও পরে বিষয়টা সাধারণই মনে হবে আপনার কাছে। ফিটনেস ভালো হলে সপ্তাহে চার দিন ব্যায়াম করলেই চলে। পরের দুই দিন বডি ম্যাসাজ এবং একদিন পূর্ণ বিশ্রামের দরকার হবে। তবে প্রথম দিকে ছয় দিন ব্যায়াম আর এক দিন বিশ্রামের দরকার পড়ে। পেশি তৈরি করতে শুরুতেই যোগব্যায়াম করতে হয়। এরপর রয়েছে আরো ব্যায়াম।



বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ পুরস্কার হাতে বড় ভাইয়ের সাথে অহনা


বডিবিল্ডিংয়ের জন্য খাদ্যাভ্যাস একটা বড় ভূমিকা রাখে। যারা মোটা অবস্থায় জিমে গিয়ে পেশি গঠন করতে চান, তাদের জন্য থাকে একধরনের খাবার তালিকা। আবার ওজন কম হলেও থাকে আলাদা খাবার তালিকা। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষক ছাত্রীর পরীক্ষা করে নানা ধরনের ব্যায়াম ও খাবারের তালিকা দেবেন। এটি মেনে চলতে হবে।


অহনা বড়ভাইয়ের কাছে জেনেছেন শরীরের ফ্যাট কমাতে চাইলে কার্বোহাইড্রেটটা কম খেতে হবে আর প্রোটিনটায় ভালো মনোযোগ দিতে হবে। মানে একটু বেশি খেতে হয় প্রোটিন। ফলে শাকসবজির দিকে বেশি ফোকাস করতে থাকেন তিনি। কমিয়ে দিলেন রুটি ও ভাত খাওয়া। আর সেই নিয়ম মেনে চলছেন এখনও। তবে সময় ধরে নিয়মিত ব্যায়াম এবং আত্মবিশ্বাস তার স্বপ্ন ধরার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে বলেও মনে করেন তিনি।


রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের বডিবিল্ডিংয়ে উঠে আসার ব্যাপারটি বেশ প্রশংসিত হয়েছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বডি বিল্ডিং প্রতিযোগিতায় যেখানে বিকিনির জয়জয়কার, সেখানে বাংলাদেশের প্রতিযোগিরা ছিলেন পোশাকের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সচেতন।



নৃত্য পরিবেশন করছেন অহনা


পোশাক নিয়ে অহনার ভাষ্য, বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতায় যথাযথ ড্রেস কোড বড় একটা বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপে বিকিনি পরা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় অনুভূতি ও সংস্কৃতির কথা মাথায় রেখে প্রতিযোগীদের পোশাক নির্বাচন করা হয়। চ্যাম্পিয়নশিপে নারীদের ড্রেস কোড ছিল-টপস ও লেগিংস।


শিরোপা জয়ের অনুভূতি কেমন ছিল? বিজয়ী অহনা বলেন, আমি সত্যিই ভীষণ খুশি। এর জন্য আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি। কেউ আমার পেশিবহুল শরীর দেখে সমালোচনা করবে, এমন ভাবনা কখনই মনে আসেনি। ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে আয়োজকরা পোশাক নিয়ে খুবই সচেতন ছিলেন। আমরা পোশাক হিসেবে টপস ও লেগিংস প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি। আমার দৃষ্টিতে এই প্রতিযোগিতায় আমাদের জন্য সঠিক ড্রেস কোডটাই ছিল। এটা বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেরা।



বড় ভাইয়ের সাথে অহনা


ক্যারিয়ার হিসেবে বডিবিল্ডিংয়ের নারীদের সম্ভাবনা নিয়ে আত্মপ্রত্যয়ী তরুণী বলেন, একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শুধু রাজধানীতেই অসংখ্য জিমনেশিয়াম গড়ে উঠেছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এখন তাদের শরীরের গঠন নিয়ে অনেক সচেতন। ছোট থেকেই জিমনেশিয়ামে যাচ্ছেন শরীরচর্চা করতে। উন্নত দেশে এটা তো নারীদের জন্য জয়জয়কার। উন্নত দেশগুলোতে নারীরা পারলে আমরা পারবো না কেন? বাংলাদেশের বডিবিল্ডিং ফেডারেশনের আয়োজনে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় যে সাড়া ফেলেছে এটাই প্রমাণ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীদের জন্য ক্যারিয়ার হিসেবে বডিবিল্ডিংয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। বাংলাদেশের বডিবিল্ডিং ফেডারেশন এভাবে প্রতিয়োগিতার আয়োজন করে নারীদের বডিবিল্ডিংয়ে উৎসাহিত করলে একটা সময় নারী ক্রিকেটার, টেনিস, হকির মতো এটাও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগও করে দেবে।


ছোটবেলা থেকেই ভীষণ নাচতে পছন্দ করেন অহনা। নাচের উপরে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তাই স্কুল-কলেজে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি নৃত্য পরিবেশন করেন।



রাজধানীর লালবাগে রায়হান ফিটনেস সেন্টারে অহনার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বিবার্র্তা স্টাফ রিপোর্টার


স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল- এই সত্য খুব ভালো করেই বিশ্বাস করেন অহনা। তাই তো স্বাস্থ্য নিয়েই তার আগামীদিনের পথচলার স্বপ্ন। তবে তার একার স্বাস্থ্য নিয়েই শুধু ভাবেন না অহনা। ভাবেন পুরো দেশের তরুণীদের স্বাস্থ্যের কথা। স্বপ্ন দেখেন পড়লেখা করে নারীদের জন্য কিছু কাজ করার। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। পাস করে বডিফিটনেস ও নিউট্রিশন বিষয়ে আরো বেশি জানতে চান অহনা। ভবিষ্যতে দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক বডিবিল্ডিং কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করতে চান অহনা। সেই সঙ্গে একজন ফিটনেস আইকন হয়ে দেশের তরুণীদের স্বাস্থ্যবান ও সুস্থ-সবল জীবনযাপনে ফেরাতে চান এই উদ্যোমী তরুণী।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com